FeaturesIn PhotosInvisible PeopleSpotlight

ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: লিফট ব্যবস্থাপনায় যারা

হোক সকাল ৮টার ক্লাস কিংবা দিনশেষে বাড়ি ফেরার তাড়া, প্রায়ই আমাদের দিনগুলি হয়ে উঠে একটি সময়ের প্রতিযোগিতা। এসকল প্রয়োজনীয়তায় কিংবা অলস রুটিনে আমরা ভুলে যাই আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে  থাকা সেই মানুষদের কথা যারা আমাদের জরুরি যাত্রাগুলোকে সহজ করে প্রতিদিন। তাদের গল্পগুলো লিফটের দরজা ছাড়িয়ে চলে যায় আমাদের ভাবনার ওপাড়ে। বলছিলাম আমাদের  লিফট টেকনিশিয়ানদের কথা।

মোঃ সুমন শেখ Photo Credit -Kanita Rydwana
মোঃ সুমন শেখ

ক্যাম্পাসে তাদের আগমন ভোর ৭ টায় এবং দীর্ঘ কর্মদিবসের ইতি ঘতে রাত ৯টায়। তাদের দায়িত্ব লিফটের চার দেয়ালে বন্দি হলেও দক্ষতা রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতের আঙ্গিনাতেও। মোহাম্মদ সুমন শেখ ২০১৭ সালে শুরু করেন তার ব্র্যাকইউ-এর চাকুরিজীবন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে তার সময় গুলো ভালোই কাটে । তবুও সে বলে, “সবাই মনে করে কেবল লিফটে বসে থাকা সহজ দায়িত্ব, তবে এট খুবই দমবন্ধকর লাগে; কেবল ১ ঘণ্টার বিরতি  বিশ্রামের জন্য খুবই কম।”

সুকান্ত সোমদ্দার এবং মোহাম্মদ রাহাত তালুকদার(Photo Credit -Kanita Rydwana
সুকান্ত সোমদ্দার এবং মোহাম্মদ রাহাত তালুকদার

অন্যদিকে মোহাম্মদ রাহাত তালুকদার ও সুকান্ত সোমদ্দার রসিকতা করে বলেন, কাজের ফাঁকে এক ঘণ্টার বিরতিগুলোই যেন সবচেয়ে ভালো দিক। ৬ বছরের ছোট-বড় এই সহকর্মীর জুটি আগেও অন্য এক প্রতিষ্ঠানে লিফট টেকনিশিয়ান হিসেবে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কর্মরত ছিলেন । পেশাগত ভাবে কিছু অপূর্ণতা থাকলেও, তারা বিশ্বাস করেন এখানে হাসি-খুশি কর্ম পরিবেশের পাশাপাশি সুযোগ-সুবিধাও পাওয়া যায় যা আগের কর্মস্থলে ছিল না। রাহাত বলেন, “আমরা সকলে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছি, তাই সবক্ষেত্রে শান্তি বজায় রাখা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কঠিন।” 

মোসাম্মদ হাসি আক্তার Photo credit -Dia Nur Sehba
মোসাম্মদ হাসি আক্তার

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিফট টেকনিশিয়ান হিসেবে কর্মরত দুইজন নারীর মধ্যে একজন মোসাম্মত হাসি আক্তার। ২০১৯ সাল থেকে তিনি কর্মরত আছেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মাঝেও হাসির জীবনে লুকিয়ে থাকে এক নিরব আনন্দ। বিরতির সময়ে কিভাবে কাটান – এই প্রশ্নের উত্তরে সাত মাস বয়সী কন্যা তাসফিয়ার কথা বলতে গিয়ে হাসির চোখ স্নেহে ভরে উঠে। ব্র্যাকইউ-এর কাছাকাছি বসবাস করার সুবাদে বিরতির সময় তিনি দ্রুত মেয়ের কাছে ছুটে যান । এ বিষয়ে সহকর্মীদের সহযোগিতায় তিনি  কৃতজ্ঞ। লিফটের ভিতরে কাজ করে হাসি পরিচিত মুখগুলোর ভিড়ে জীবনের মানচিত্র আঁকতে শিখেছেন। আধোঘুম ও ক্লান্ত মুখ, তাড়াহুড়োয় থাকা যাত্রী, আর যারা কিছুক্ষন থেমে সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যারা – তাদের সবার কথাই হাসি মনে রাখেন। নির্জন ও একঘেয়ে ক্যাম্পাসের চেয়ে এই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তগুলোই তার বেশি প্রিয়।

মোঃ ফিরোজ খান Photo Credit -Kanita Rydwana
মোঃ ফিরোজ খান

এমনই আরেকজন হলেন মোহাম্মদ ফিরোজ খান। ২০২৩ সালে তিনি যোগ দেন ব্র্যাকইউ-তে। তিনি এবং তার স্ত্রীর দুজনই এখানে কর্মরত। দুর্ঘটনায় ছেলেকে হারানো ও মেয়েকে আত্মীয়দের কাছে রেখে আসার পর, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিদিনের এই ছোটখাট আলাপের মধ্যেই ফিরোজ খুঁজে পান সান্ত্বনা। সার্ভিস লিফট এ উঠতে না পারলে শিক্ষার্থীদের যে অধৈর্যতা তৈরি হয়, তা তিনি বোঝেন। শিক্ষার্থীদের কাজগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন, যেন তাদের পরিশ্রম বিফলে না যায়।

সকলের কথাতেই সন্তানদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যায় । যেমন,সুমন স্বপ্ন দেখেন নিজের গ্রামের বাড়িতে একটি খামার গড়ার। এই ছোট্ট চারকোণা কেবিনগুলোর কোণায় কোণায় লুকিয়ে আছে অসংখ্য না-বলা গল্প । গল্পগুলো বয়ে বেড়ান সেই মানুষগুলো যারা প্রতিদিন আমাদের ভিড়ের মাঝে নীরবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাড়াহুড়োর এই যাত্রাপথে একটুখানি শুভেচ্ছা তাদের দিনটিকে উষ্ণতার ছোঁয়ায় আলোকিত করতে পারে। 

Rawhi Deema Reza

Rawhi Deema Reza is the Features Editor of the 10th Student Editorial Board. She is a junior majoring in Biotechnology under the School of Life Sciences. Reach her at rawhi.deema.reza@g.bracu.ac.bd

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *