ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: নীরব পরিশ্রমে সচল বিভাগ
ক্যাম্পাসজুড়ে প্রত্যেক বিভাগেই এমন কয়েকজন পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা মানুষ আছেন, যারা সেই বিভাগের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে খেয়াল রাখেন এবং নীরবে কাজ করে যান। সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ত সময়সূচি ও ভারী কাজের চাপ বহন করলেও তাদের এই অবদান অনেক সময় চোখে পড়ে না। তবুও নিজেদের কাজ থেকেই পাওয়া দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠাই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের একজন কর্মী, নাজমা, তার দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগেই। তিনি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত, সপ্তাহে সাত দিন কাজ করেন। বাড়ি ফিরে রান্না ও ঘরের কাজ সেরে অনেক সময় রাতে মাত্র দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান। একইভাবে, ব্র্যাক ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী, মনি, নতুন ক্যাম্পাসের কাছাকাছি উপযুক্ত বাসা না পাওয়ায় প্রতিদিন মহাখালী থেকে বাড্ডা হেঁটে যাতায়াত করেন। ১০ ঘণ্টার কর্মদিবসের আগে ও পরে মিলিয়ে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয়। বাড়িতে ফিরেও রান্না ও পরিষ্কারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তার বিশ্রামের সময় নেমে আসে মাত্র চার ঘণ্টায়।

একই স্থানে পাশাপাশি, গণিত ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিভাগ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ অবস্থান করলেও সেখানে দায়িত্বে রয়েছেন অল্প কয়েকজন মানুষ। নির্দিষ্ট অভ্যর্থনাকর্মী না থাকায় তারা একে একে দায়িত্ব সামলে দুই বিভাগের প্রায় ৫০ জনের বেশি শিক্ষককে সহায়তা করেন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, বিভাগীয় আয়োজন ও পরীক্ষা সময়ের ব্যস্ততা, এমনকি কখনো কখনো শিক্ষার্থীরাদের বিরক্তি প্রকাশ করা সত্ত্বেও তারা কোনো অভিযোগ ছাড়াই কাজ চালিয়ে যান।

কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাইদুল ইসলাম নিজের পড়াশোনা শেষ করতে না পারলেও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। প্রতিদিন সকালে ব্যায়ামের জন্য সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসে আসেন এবং একদিন জাপানে পড়াশোনা ও কাজ করার আশায় ব্র্যাকইউ-তে জাপানি ভাষার ক্লাসও নিচ্ছেন। অন্যদিকে, ওয়াহিদুজ্জামান ও তার স্ত্রী দুজনেই ব্র্যাকইউ-তে কর্মরত। কর্মঘণ্টার সময় তাদের ছোট সন্তানকে ডে-কেয়ারে রাখতে হয়। তবে বড় ছেলে, যার বয়স ছয়, এখন ডে-কেয়ারের বয়স পার করায় দাদির সঙ্গে খুলনায় থাকে। ছেলেকে দেখার জন্য ওয়াহিদুজ্জামান প্রতি সপ্তাহেই খুলনায় যাতায়াত করেন।

অনেক কর্মীদের কাছেই এখন এই বিশ্ববিদ্যালয় তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, ফলে প্রিয়জনদের জন্য সময় বের করা হয়ে পড়েছে কঠিন। ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা জীবনযাত্রার খরচ তাদের সীমিত আয়ের ওপর সৃষ্টি করছে বাড়তি চাপ। সপ্তাহজুড়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেও তারা হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। তাদের এই নীরব পরিশ্রম যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পর্দার আড়ালে থাকা মানুষগুলোর গুরুত্ব এবং তাদের স্বীকৃতি দেওয়া ও মূল্যায়ন করা অপরিহার্য।


