ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: প্রতিদিনের যাত্রায় গড়ে ওঠে স্বপ্ন
পূর্বে সূর্য ওঠার সময়, প্রথম কোনো শিক্ষার্থীর ঘুম ভাঙার আগমুহূর্তেই, ব্যস্ত শহরের সড়কে বাসের ইঞ্জিন চলতে শুরু করে। সতর্ক দৃষ্টি এবং স্থির হাতে তারা প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেন। তবুও, তাদের কথাগুলো আমাদের গল্পের পাতায় খুব কমই জায়গা করে নেয়। ব্র্যাকইউ-এর এই নীরবে কাজ করা মানুষদের ভিড়ে এই গল্পটি আমাদের পরিশ্রমী বাস চালকদের, যারা তাদের ব্যস্ততা এবং শ্রমের আড়ালে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সচল রাখেন।

ব্র্যাকইউ বাস নম্বর ২-এর মিরপুর-এ রুটের চালক সেন্টু মিয়া গত দুই বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা বর্তমানে ঢাকায় তার স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন। তার দিন শুরু হয় ভোরের আগেই। ভোর ৪টায় উঠে সকাল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছে বাস পরিষ্কার ও পরীক্ষা করে শিক্ষার্থীদের তুলতে বের হন। একের পর এক যাত্রা, দ্রুত আহার এবং অল্প বিশ্রামের মাঝেই কেটে যায় তার পুরো দিন। রাত প্রায় ১০টায় তিনি বাড়ি ফেরেন। এত দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দিনের মাঝেও সেন্টু মিয়া থাকেন ধৈর্যশীল ও আন্তরিক। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেন, “আমি কষ্ট করি, কিন্তু যাদের আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেই, তারা আমার চেয়েও বেশি পরিশ্রম করেন।” যানজট এবং ক্লান্তির মধ্যেও তিনি নিজের কাজে সদয় এবং গর্ব নিয়ে এগিয়ে চলেন।

ব্র্যাকইউ বাস নম্বর ৩-এর মিরপুর-বি রুটের চালক মো. হামিদ রহমান প্রতিদিন ভোর ৫টায় দিনের কাজ শুরু করেন, শিক্ষার্থীদের সময়মতো ও নিরাপদে ক্লাসে পৌঁছে দিতে। এটি তার জীবনের প্রথম বাস চালানোর অভিজ্ঞতা হলেও প্রতিদিন তিনি দায়িত্ববোধ নিয়ে হাজির হন। দিনে গড়ে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমালেও কখনো অভিযোগ করেন না। সহকর্মীরাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, প্রয়োজনে যারা সবসময় পাশে দাঁড়ান।
তার দায়িত্ববোধের বাইরেও রয়েছে মানবিকতা। রমজান মাসে, সড়কে তীব্র যানজট থাকায় রোজা রাখা শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি কন্ডাক্টরকে খেজুর ও পানি কিনতে পাঠান যেন তারা সময়মতো ইফতার করতে পারে। সেই দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, “ওটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।” কুড়িগ্রামের একটি বড় পরিবার থেকে আসা হামিদ রহমান শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি। তবুও তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই, আছে কেবল অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি। তিনি জানেন, তিনি দেরি করলে শিক্ষার্থীরাই ভোগান্তিতে পড়বে; এই ভাবনাই তাকে সময়মতো কাজে আসতে অনুপ্রাণিত করে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তার উপদেশ, “পড়াশোনার মূল্য আছে অবশ্যই কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো ভালো মানুষ হওয়া।”

ব্র্যাকইউ স্টাফ বাসের চালক মো. আবদুল বারী দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দায়িত্ব পালন করছেন। নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আবদুল বারী তিন সন্তানের বাবা। শিক্ষার্থীদের জন্য বাস সচল হওয়ার আগেও তিনি ব্র্যাকইউ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিয়ে যেতেন। তিনি বলেন, “এই ক্যাম্পাস আমাদের ভালোভাবে রাখে। বিশ্রামের জন্য ঘর আছে, কেরাম খেলার ব্যবস্থাও আছে।” তবে তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হলো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। অনেকেই আজও তাকে চিনে নেয়, থেমে একটুখানি হাসি ভাগ করে নেয়।
দিন শেষে, ব্র্যাকইউ-এর এই বাস চালকেরা গর্বিত হয় এই ভেবে যে, প্রতিদিন একেকটি নিরাপদ যাত্রার মাধ্যমে তারা শত শত স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারেন।

