ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: নিরাপত্তার অটল অভিভাবকবৃন্দ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পেছনে সর্বদাই নিয়জিত থাকেন একদল নিরাপত্তাকর্মী। অথচ আড়ালে থেকে যায় তাদের গল্প। আজ বলবো ক্যাম্পাসের এমনই চার নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবকের গল্প, যারা প্রত্যেকেই প্রায় ১৫ বছর ধরে আগলে রেখেছেন ব্র্যাকইউ-কে। তারা হলেন মুস্তারি বেগম, মোহাম্মদ আত্তাব উদ্দিন, মোহাম্মদ আবদুল আলিম এবং মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান।
সাধারণত এই নিরাপত্তাকর্মীরা দুই ঘন্টা অতিরিক্ত সময় সহ কর্মঘন্টা কাটান প্রায় ১০ ঘন্টা। যার মাঝে তাঁরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটক ও অন্যান্য গেট সহ ল্যাব, লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন প্রবেশ ও বেরোনোর গেটে নিরাপত্তা দেবার কাজ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জরুরি ও অগ্নি নির্বাপক নীতি ও প্রক্রিয়া পরিচালনার কাজও তারা করেন। লম্বা কর্মঘন্টা কখনো কখনো হয়ে ওঠে অত্যন্ত ক্লান্তি আর অবসাদের। তবে এ অবস্থায়েও অটল আমাদের এই নিরব অভিভাবকেরা। যেমনটি মনে করেন আলিম। বছরের পর বছর করা পরিশ্রম যেন তাদের কঠিন এ জীবনেই অভ্যস্ত করে তুলেছে, এমনটি বিশ্বাস করেন তিনি।
অন্যদিকে মুস্তারি আপার এ কাজে আসার পেছনে রয়েছে আরও গভীর এক গল্প। ব্র্যাকইউ-তে যুক্ত হবার আগেও দীর্ঘ ৬ বছর তিনি ব্র্যাকের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গ্রামে গ্রামে নারীর উন্নয়নের কার্যক্রমের অংশ ছিলেন। সেই অনুপ্রেরণাতেই যোগ দিয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে এখানেই তার গল্প শেষ নয়। তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেক অধ্যায়ের নাম তার বিশেষচাহিদাসম্পন্ন ছেলে মিশু। প্রত্যেকদিন ভোর চারটায় তাকে প্রস্তুত করেই তিনি ব্র্যাকইউ-এর উদ্দেশ্যে রওনা হন।

এতটা নিবেদিত থাকা সত্ত্বেও কখনো কখনো তাদের পরতে হয় অনাকাঙ্খিত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে। এমনটাই মনে করেন আত্তাব ভাই যখন শিক্ষার্থীরা তাকে আইডি দেখায় না, এমনকি ন্যূনতম সম্মানটুকুও দেয়া থেকে দূরে থাকে। অথচ তারা কেবল তাদের কর্তব্যটুকুই পালন করছিলেন। এদিকে আলিম ভাই জানান অনেক সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের দুর্ব্যবহারও সহ্য করতে হয় তাদের। তবে এত কিছুর পরেও তাদেরকে নিরাপত্তা দেবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তিনি। সব শেষে অভিযোগশুন্যভাবে দিন শেষ হলেই সন্তুষ্ট তিনি।
হতাশার বুক চিরেই আত্তাব ভাই জানান সম্মান পাবারও গল্প, যার পেছনে ধন্যবাদ জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যহীন নীতিকে। মাহমদু ভাই আরও সুন্দর করে বলেন, “দেখেন পরিবারের সব সদস্য সমান হবে না। অল্পকিছু শিক্ষার্থী এমন অবস্থার সৃষ্টি করে। তবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভাল ব্যবহার করে।” কাজের পেছনের এই একাগ্রতার হিসাবও দিতে হয় তাদের। আত্তাব ভাইয়ের বড় সন্তান তার কষ্ট বুঝলেও ছোট মেয়ে বাবাকে লম্বা সময় কাছে না পেলে কথা বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে মুস্তারি আপার পরিবার মেনেই নিয়েছে লম্বা কর্মঘন্টার কঠিন এ বাস্তবতা। গত জুলাইয়ে পুলিশের গুলির মখেু দাঁড়াবার স্মৃতিচারন করতে করতে এমনটি তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা আমার সন্তানের মতো। তাদের জন্য পুরো জীবনটাই দিয়ে দিয়েছি আর তাদের জন্য জান দিতেও আমি প্রস্তুত।” আর এর সর্বোচ্চ পুরষ্কারের প্রশ্নে তিনি বলেন, “দেশ-বিদেশ থেকে ফেরা বহু শিক্ষার্থী আমায় এসে জড়িয়ে ধরে। এই অনভুুতি আমি বলে বোঝাতে পারবো না, নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হয়। এমন সব দিনেই মনে হয় আমি কিছু করতে পেরেছি।”

জরুরি বা বিপদ-আপদে সবার আগে ঝাপিয়ে পরা এ নিভৃতচারীরাই কিন্তু সবার শেষে ক্যাম্পাস ছাড়ে। অথচ বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সম্মান আর ভালবাসা পেলেই তারা খুশি।

