ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: ক্যাম্পাসের পথচলার সহযাত্রীরা
কল্পনা করুন, আপনি জীবনের ২২টি বছর কাটালেন কঠোর পরিশ্রম করে, কিন্তু শেষ বয়সে এসে সেই পরিশ্রমের কোনো ফসল আপনার কাছে নেই। এটা নিছক কোনো বিষণ্ণ কল্পনা নয়, এটা আব্দুর রশিদের জীবনের কাহিনী। ক্যাম্পাসের ৮ তলার বি ব্লকে হয়তো তাকে দেখেছেন। তিনি একা নন, তার মত অনেকেই আছেন ক্যাম্পাসের প্রতি তলায়, প্রতি ব্লকে। তারা ক্যাম্পাসের অদৃশ্য মানুষ।
অক্টোবর মাসে কর্মজীবনের ২২ বছরে পা দেওয়া আব্দুর কাজ করেছেন মানব সম্পদ এবং উপাচার্যের অফিসে। আব্দুর থাকেন এক সন্তান এবং স্ত্রীর সাথে, যিনি নিজেও একজন ফ্লোর কর্মকর্তা। জীবনের অনেকটুকুই এই প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে থাকা আব্দুর, দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন ৩ বার, যা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার পেশাগত উন্নতির। শিক্ষাগত দিক দিয়ে আব্দুর একজন সামাজিক বিজ্ঞান স্নাতক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে কোর্স করেছেন, কম্পিউটারের জ্ঞানও তার আছে। নিজের ভাগ্যকে বদলানোর সব চেষ্টা করলেও ভাগ্য তার সহায় হয়নি। তবু আব্দুর অসুখী নন, তিনি চান ভবিষ্যতে অবসর নিয়ে বাড়ি গিয়ে খামার দেবার।
নাজমিন নাহারের ব্র্যাকের সাথে পরিচয় স্বামী আব্দুর রশিদের হাত ধরেই। প্রতিষ্ঠান একই হলেও তাদের কর্মস্থল আলাদা – নাজমিন কাজ করেন ১১ তলার বি ব্লকে। নাজমিন উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেননি, সন্তার জন্মের পর পূর্বের কর্মস্থান আড়ং ছেড়ে যোগ দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেসময় নারীর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ছিল বেশ কঠিন। নাজমিনের ইচ্ছা সন্তানকে ভালো শিক্ষা দেওয়া এবং স্বামীর পাশে থাকা- আব্দুর রশিদের সাথে খামারের কাজ অংশ নিতে তিনিও প্রস্তুত।

Photo credit – Maisha Marium
১০ তলার ব্লক এফ-এ পাওয়া যায় মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমানকে, যিনি আমাদের সাথে আছেন প্রায় ১৯ বছর ধরে। ভোলার সন্তান মাকসুদুর নিজে স্নাতক পাশ, এবং তিনি ছাত্রদের অনেক ভালোবাসেন। ভালোবাসা একমুখী নয়, ব্র্যাকের পুরনো ছাত্ররা এখনো আসেন তার সাথে দেখা করতে। বাড্ডায় কাজ করলেও মাকসুদুর এখনো থাকেন মহাখালীতে, স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে। ভবিষ্যতে মাকসুদুর ব্র্যাকের থাকতে চান, যতদিন পারেন।

photo credit – Maisha Marium
অন্যদিকে ৩১ অক্টোবর ছিল ব্র্যাকে মোহাম্মদ রুহুল আমিনের শেষ দিন। দীর্ঘ কর্মজীবনের অনেকটাই তার কেটেছে ব্র্যাকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ২০০৪ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা আমিন এখন ৭১ বছর বয়সী। সময় হয়েছে তার যথা অর্জিত বিশ্রামের, এটি ভেবেই বিদেশ থাকা তার ৩ সন্তানেরা খুশি। স্ত্রীকে নিয়ে আমিন থাকেন দক্ষিনখান, তার ছোট বাড়িতে। ভবিষ্যৎ কি রেখেছে আমিন জানেন না, কিন্তু তিনি আশাবান।
বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জন্য জীবনের একটা ছোট অংশ, কিন্তু এসব কর্মচারীদের জন্য এটাই জীবন। আমরা চলে গেলেও প্রতিষ্ঠানকে নিজ হাতে গড়া এসব মানুষ থেকে যান, অদৃশ্য হয়ে।

photo credit – Maisha Marium
