ব্র্যাকইউ-এর অজানা গল্প: ক্যাম্পাসের প্রযুক্তি রক্ষায় যারা
আমাদের চারপাশের সবকিছু নিয়েই আমাদের পরিবেশ”, তৃতীয় শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের এই বহুল ব্যবহৃত বাক্যটি আজও স্নাতক জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতায় সমানভাবে প্রযোজ্য। এই লেখনিতে তুলে ধরা হয়েছে সেই সকল নীরব মানুষদের গল্প যারা ক্লাসের মাঝখানে প্রজেক্টর বা কম্পিউটার এর যান্ত্রিক গোলযোগ সামলাতে ছুটে আসেন। এমনই তিনজন নিবেদিত প্রাণকর্মী তাদের অভিজ্ঞতা ও পর্দার আড়ালের জীবন তুলে ধরেছেন, যেখানে প্রায়শই পরিশ্রম থেকে যায় অবহেলিত।
মোহাম্মদ আসিফ ইকবাল ব্র্যাকইউ-তে গত ৪ বছর যাবত সহকারী হিসেবে কর্মরত। প্রতিদিন সকাল ৭টা ৩০মিনিটে তার কর্মদিবস শুরু হয় এবং অধিকাংশ দিন রাত ৯টা ৩০ পর্যন্ত কাজ করতে হয়, যা নির্ধারিত সময়ের থেকে প্রায় ৩ ঘন্টা বেশি। তিনি জানান, দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর কর্মঘণ্টাই এই পেশার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে আগে চলে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনকি বিশ্রাম বা নাস্তার জন্যও সময় পাওয়া যায় না। তবুও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে খুশি করে। যদিও কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের অসংবেদী আচরণে তিনি মর্মাহত হন, তবুও তিনি হাসি মুখে বলেন, এই কাজ তার জন্য আশীর্বাদ। তার কথায়, “সব মানুষ একরকম হবে না, এটাই স্বাভাবিক।”

একইভাবে, সাত বছর ধরে কর্মরত মো. রাসেদুল ইসলাম, মহাখালী থেকে বাড্ডা পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। প্রায় প্রতিদিনই তাকে সন্ধ্যা ৫টা ৩০মিনিটের পরও অতিরিক্ত সময় ক্যাম্পাসে কাজ করতে হয়। শিক্ষার্থীদের অসহযোগিতার কারণে মাঝেমধ্যে দায়িত্ব পালনে অসুবিধা হয় বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তবে দীর্ঘ যাত্রা ও ক্লান্তিকর শিফট সময়ের পরেও নিজের কাজের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, “চাকরীর প্রতিটি দিনই একএকটি নতুন স্মৃতি।” তবে এসব স্মৃতির মধ্যে মহাখালী ক্যাম্পাসে এক শিক্ষার্থীর ফোন খুঁজে পেয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটি তার জীবনের সেরা স্মৃতিগুলোর একটি। তিনি বলেন, “ফোনটি ফেরত পেয়ে শিক্ষার্থীটি এত খুশি হয়েছিল যে বাইরে থেকে আমাকে কেক কিনে দিয়েছিল।”

শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবে সমস্যা সমাধানে কাজ করা অফিস সহকর্মীদের পাশাপাশি আরেকদল কর্মী রয়েছেন, যারা প্রযুক্তিগত ত্রুটি সংশোধন ও যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাদেরই একজন ফিরোজ আলম, ফার্মেসি বিভাগের ল্যাব টেকনিক্যাল অফিসার। কুড়িগ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ ছয় সদস্যের পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজের এই দায়িত্বকে তিনি সুশৃঙ্খল ও স্থিতিশীল বলে মনে করেন। তার মতে, “একসাথে অনেককে সহায়তা করা কিছুটা শ্রমসাধ্য, তবে কাজটি অনেক উপভোগ্য।”

এসকল হাতেগোনা গল্প সেই মানুষগুলোর, যারা প্রতিদিন অবিরত আমাদের শিক্ষার সহায়তায় শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। যাদের অবদান আমাদের চোখে প্রায়শই তুচ্ছ মনে হয়, অথচ তাদের পরিশ্রম ছাড়া এই যাত্রা অসম্পূর্ণ। তাই তাদের অবদানের প্রতি অবহেলা না করে সম্মান জানানো, তাদের সংগ্রাম ও শক্তির গল্পকে সকলের কাছে তুলে ধরা আমাদের কর্তব্য।
